শিশু শিক্ষা ও বাস্তবতা:শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শন

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “ Mere literated learning is not Education; trained habits which induce intelligence with every consistency and make the system habituated accordingly is education. ( The Message. Vol :7, 60)

কিন্তু আজকের চলমান বিশ্ব সমাজে, যে সমাজে স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্টানের উচ্চ ডিগ্রী অজর্নকে শিক্ষার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়, যেখানে এসব প্রতিষ্টানে একটি মাত্র আসন লাভের জন্য কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষক-ছাত্র ও অভিভাবকের সম্পর্ক অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে ঘুরপাক খায় ভাল নম্বর অর্জনের দিকে।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “মা-কেন্দ্রিক শিশুরা নম্র,শান্ত ও উদার প্রকৃতির হয়”। শিশুকাল থেকেই ভালবাসার চর্চা করতে হবে। পিতার খেয়াল রাখতে হবে মায়ের প্রতি সন্তানের ঝোঁক যেন বাড়ে। মাও চেষ্টা করবেন পিতার সাথে সম্পর্ক যেন নিরবচ্ছিন্ন হয়। সন্তানের সামনে মা, পিতার ও পিতা, মা’র প্রশংসা করবেন। পিতা-মাতা উভয়েই একে অন্যের স্থান যেন সন্তানের অন্তরে স্থান করে নেই সেই চেষ্টায় করবেন। পিতা-মাতার চেষ্টা করা উচিত যাতে শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের শ্রদ্ধা বাড়ে। (আলোচনা প্রসঙ্গে,৭ম খন্ড, ৯/৫/১৯৪৬)

শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শন অনুসারে, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য, শিক্ষা অর্জন প্রক্রিয়ার মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেছেন, শিক্ষা হলো আচার, ব্যবহার ও চরিত্র। কিন্তু এ বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও থাকে না এবং শিক্ষা প্রতিষ্টানের ক্যাম্পাসেও থাকে না। আচরণশীল আচার্য্যরে প্রতি ভালবাসার ভিতর দিয়ে তা লাভ করা যায়। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:৮, ১৮/৫/১৯৪৬)
তাই শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন, “ The teacher needs to be a person of majestic stature, one of character and love ” (আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:১৩, ২৫/৭/১৯৪৮)

শ্রীশ্রীঠাকুর চাইতেন যেন শেশব থেকেই শিশুদের মধ্যে সবধরনের চর্চার সঞ্চারন ঘটানো হয়। তাই তিনি বলেছেন, “আধো কথার সময় হতে/ করে করিয়ে যা শিখাবি/ সেটাই ছেলের মোক্ষম শিক্ষা / হিসাবে চল, না হয় পস্তাবি”
যদি কোন শিশুর অন্তরে অভ্যাস, ব্যবহার, উপলব্দি করার ক্ষমতা, অনুরাগ, সেবা, সমস্যা সমাধানের মনোভাব, ভাবা ও করার সুসাঞ্জস্যতা ইত্যাদি ৫-৭ বছর বয়স থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তার পড়ালেখা তরান্বিত হয়। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:৭, ১১/৪/১৯৪৬)
তিনি শিশুদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে একটা মন্ত্র বলব। তোমার বাবা-মা’কে ভালবাস; তাদের ভক্ত হও, তাদেরকে মান্য করতে শেখো এবং তাদের খুশি রাখতে চেষ্টা কর। তাহলে তোমরা দেখতে পাবে, সুসমন্বয়তা তোমার জীবনে অভ্যর্থনা জানাবে। (আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:৭, ৬/৪/১৯৪৬)

শ্রীশ্রীঠাকুর তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদানের ভিত্তি হিসেবে হাতে-কলমে করার ভিতর দিয়ে দক্ষতা, জ্ঞান ও চাওয়ার যে অভিজ্ঞতা তার উপরে প্রাথমিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, ৮ম খন্ড, ১১/৫/১৯৪৬)

তিনি বলেছেন, আমরা শিক্ষাকে পড়া-লেখার সামর্থ্য হিসেবে বিবেচনা করছি কিন্তু শারিরীকভাবে বাস্তব কাজ করার ভিতর দিয়ে যে মানের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব তা বুঝতে পারছিনা। গৃহপালিত পশু যেমন: গরু, কুকুর, পাখি ইত্যাদির লালন পালনের ভিতর দিয়ে আমাদের উপলব্দি করার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য পরিমানে বৃদ্ধি পায়। যদি তোমাদের গৃহে কোন অতিথি আসেন, তাহলে তাদের সেবা যতেœ তোমাদের সন্তানদেরকে যুক্ত করা উচিত। যদি প্রতিবেশীর গৃহে কোন অনুষ্ঠান থাকে, তাহলে তাদের সাহায্য করার জন্য তোমাদের সন্তানদের পাঠাবে। যদি বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি বাগান থাকে, সেখানে সবজি উৎপাদনে নিজের সাথে সন্তানদেরকেও যুক্ত করবে। যদি বাজারে কিছু কেনা কাটা করতে যাও, তাহলে সাথে শিশুদেরকেও নিয়ে যাও। এর ফলে তারাও আস্তে আস্তে কেনা-কাটা শিখে যাবে। তাদেরকেও শিক্ষা দাও কিভাবে রোগীর সেবা করতে হয় কিংবা কিভাবে ঘর-দোড় পরিষ্কার রাখতে হয়। যদি কোন বই ছিঁড়ে যায়, তাদেরকে বলুন সূঁচ দিয়ে বইটা সেলাই করে একটা কাভার লাগানোর জন্য। যদি বাড়ির আঙ্গিনায় কোন বেড়া ভেঙ্গে যায়, তাহলে ছোটদের বলুন নতুন বেড়া তৈরিতে সাহায্য করার জন্য এবং এভাবে যতই শিশুদের হাত, পা, চোখ ও মস্তিষ্ক শক্তি লাভ করবে, ততই তারা আরো বেশী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। যদি একটা মানুষের সক্রিয় অভ্যাস, আত্মবিশ্বাস ও অনুসন্ধিৎসু সেবাপ্রবণতা থাকে, তাহলে সে কখনই বেকার হতে পারে না। যতই দিন-দিন আমরা শিক্ষার প্রধান উপাদান হিসেবে পাঠ্যপুস্তক পড়াকে গ্রহন করছি, ততই আমরা প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের পথ থেকে সরে যাচ্ছি।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:৫, ১০/৭/১৯৪৪)

তিনি আরো বলেন, যদি শিক্ষা অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্যে উদ্ভাবনী ও গবেষণামূখী মনোভাব থাকে, তাহলে
শিক্ষা গ্রহন ক্লান্তিকর মনে হবে না। আপনি যদি অন্যকে কোন বিষয়ে শিক্ষা দিতে চান, ফলে আপনার নিজের ধারণাও আরো পরিষ্কার হবে। যেখানে ভূলে যাবার সম্ভাবনা আছে, সেটাই পুন: পুন: বলতে হবে এবং পূনরাবৃত্তি করতে হবে। [ “Wherever there is a possibility to forget, then it needs to be repeated and recapitulated” The Message, Vol: VIII, 57 ]

শ্রীশ্রীঠাকুর একটি শিশুর একাধিক অভিভাবকের বিরোধী ছিলেন। কারণ, এটা শিশুর মধ্যে ভাল ও মন্দের পার্থক্য তৈরিতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তিনি শারীরিক শাস্তি প্রদানেরও ঘোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ গুহার অভ্যন্তরে থেকে পাঠ গ্রহনের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে পারে না। বাস্তব পৃথিবীতে সে প্রতারিত হয় এবং এর থেকে জ্ঞান লাভ করে। আবারো প্রতারিত হয়, আবারো জ্ঞান লাভ করে, এভাবেই জীবন এগিয়ে চলে। কেউ রাতারাতি সব শিখে ফেলবে এরকম আশা করা অনুচিত।
তিনি বলেছেন, তোমাদের সাহায্য করতে হবে এবং ধৈর্য্যশীলতার সাথে সহ্য করতে হবে যাতে ধীরে ধীরে প্রতি-প্রত্যেকে তাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ভিতর দিয়ে মহৎ মানুষে পরিণত হতে সক্ষম হয়।
(আলোচনা প্রসঙ্গে, খন্ড:৭, ১৯/৩/১৯৪৬)

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

আর্য দর্শনে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু লাভের এক অভিনব উপায়

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

আমরা সবাই বাঁচতে চায়। এ সুন্দর পৃথিবীতে নিজেদের প্রিয় মানুষ, প্রিয় পরিবেশ, প্রিয় স্মৃতি এ সব নিয়ে আমরা অনেকদিন বাচঁতে চায়। নিজেকে সুস্থ রাখতে, আরো কিছুদিন প্রিয় স্মৃতিগুলিকে আঁকড়ে ধরে এমনকি মানবেতর জীবনযাপন করেও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। তাই মহান ঋষি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের এ অতিসাধারণ আকূঁতিকে প্রকাশ করেছেন “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে / মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চায়”। প্রতিটি সত্ত্বার এক না জানা আঁকূল প্রার্থনা যেন পরমশক্তির নিকট, সে বাঁচতে চায়। কিন্তু আমরা কি ভেবেছি আমাদের এই যে চাওয়া, তার প্রাপ্তি ঘটানোর জন্য আমাদের করণীয় কী? কিভাবে অকাল মৃত্যু রোধ করা যায়? কিভাবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়?
আপনারা কি ভাবছেন, TVC বা Asian Skyshop এর বিজ্ঞাপণের মতো এ কথা বলছি কেন? TVC বা Asian Skyshop মানুষের জন্য যেসব পণ্য ও যান্ত্রিক শারীরিক সুস্থতা প্রদায়নকারী পণ্যের বিজ্ঞাপণ করে তাতে কি মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছে বা কেউ কি দীর্ঘায়ু লাভ করেছে?
বরংচ সাময়িকভাবে আমাদের শরীরতন্ত্রকে অতিমাত্রায় উত্তেজিত করে সুস্বাস্থ্যের নামে আমাদের আয়ুকে খর্ব করে দিচ্ছে। সুপ্রাচীনকালে আমাদের লোকেরা কি এসব পণ্য ব্যবহার করে সুস্বাস্থ্য লাভ করত? তাহলে কিভাবে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল? কিভাবে তারা দীর্ঘায়ু লাভ করত?

আমি আপনাদের জানা অনেক প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে খুবই সহজ ও জীবন ঘনিষ্ঠ কিছু উপায় নিয়ে আজ আপনাদের সামনে এসেছি। আমি যা জানলাম তা আপনাদের জানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না, তাই এ প্রবন্ধের অবতারণা।

আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর পূর্বে, তৎকালীন পাবনার হেমায়েতপুরে গ্রামে সৎসঙ্গ আশ্রম নামক এক স্থানে দুজন ব্যক্তির কথোপকথনকে উপজীব্য করেই আজকের এ প্রবন্ধ।

এ পৃথিবীতে আয়ুবৃদ্ধির কলাকৌশল নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, এখনও অনেক গবেষণা চলছে, এমনই এক প্রেক্ষাপটে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের জ্ঞাণের ভান্ডারে সঞ্চিত কিছু জ্ঞাণ আজ আমি উন্মোচিত করছি।
প্রশ্নকর্তা হলেন কৃষ্ণ প্রসন্ন ভট্টাচার্য্য (যিনি ভারতের পদার্থে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী গবেষক সি.ভি. রমন – এর সহকারী গবেষক ছিলেন এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি বিষয়ে মাষ্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন এবং কৃতিত্বের জন্য স্বীকৃতি স্বরুপ দুবার স্বর্ণ পদক লাভ করেন)। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আপনি বিভিন্ন বিষয়ে বিবাহ, শিক্ষা প্রভৃতির সংস্কারের কথা বলছেন। সংস্কারতো করতে হবে বুঝলাম কিন্তু নাই যদি বাঁচলাম তবে কি জন্যই বা এসব করা? আমাদের গড় আয়ু যে কুঁড়ি-বাইশ বছর নেবে গেছে। চল্লিশ বছর বয়স হতে না হতেই যে আমরা মরে যাচ্ছি, তাঁর হাত থেকে বাঁচার কোন পথ নেই কি? থাকলে সেটাইতো সর্বাগ্রে করণীয়?

উত্তরদাতার পরিচয় আমি প্রবন্ধের শেষেই দেব। উত্তরদাতা বললেন, যা’ জীবন ও বৃদ্ধিকে ধরে রাখতে পারে তাকেই বলে ধর্ম। তবেই যদি বাঁচতে চাই, বৃদ্ধি পেতে চাই – তাহলে ধর্মের বিধিগুলোকে প্রানপণে আঁকড়ে ধরে, করায়-চলায় সেগুলিকে অটুঁট ও নিরন্তন করতে হবে। তাই, সর্ব্বাগ্রে সবের ভিতর ধর্মকে নিয়ে চলা চাই-ই। এইতো আমাদের পূর্বপূরুষ ঋষিদের অমোঘ নির্দ্দেশ।
কি পাঠক বন্ধুরা বুঝলেনতো উত্তরটা।

তাহলে দেখি ঋষিরা কি বলেছেন। মহাভারতে আছে, “ধর্ম্মে বর্দ্ধতি বর্দ্ধন্তি সর্ব্বভূতানি সর্ব্বদা / তস্মিন্ হ্রসতি হীয়ন্তে তস্মাদ্ধর্ন্মং ন লোপয়েৎ ” (শান্তিপর্ব ৯০/১৬)। অন্যদিকে নোবেল বিজয়ী Maurice Maeterlinck বলেছেন, “ Ò No religion …. Ever thought of rejecting the indisputable law of endless movement of the eternal becoming ; and it must be admitted that everything appears to justify it”
উত্তরদাতা আরো বললেন, “আয়ুকে অক্ষুন্ন ও অকাট্য রাখতে হলে, শারীরিক বিধানগুলো যাতে সুস্থ সবল থাকে Ñ পোষণ ও রক্ষন দ্বারা তাই করণীয় ”।
তিনি চার ধরণের অস্বস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো: ১. মানসিক অস্বস্থতা ২. কর্ম ও আচরণের অস্বস্থতা ৩. আহার্য্য ও পরিপোষণের অস্বস্থতা ৪. চলন ও চেষ্টার অস্বস্থতা। আপনিই ভেবে দেখুন এসব অস্বস্থতা যদি এড়িয়ে চলা যায়, তাহলেই আমরা সুস্থ থাকতে পারব। আমাদের প্রচলিত ধর্মনীতিগুলো আমরা যদি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ধর্মাচরণ প্রচলণ, যাতে এ ধরণের সমস্যা এড়িয়ে মানুষ তাদের জীবনকে সুস্থ ও সাবলীন করতে পারে তার দিক নির্দেশনা আছে।

হিন্দুধর্মের অতি পরিচিত ধর্মগ্রন্থ গীতা। গীতায় আছে – যাহাদের আহার, বিহার, চেষ্টা, কর্ম, স্বপ্ন, জাগরণ ইত্যাদি উপযুক্তভাবে নিয়ন্ত্রিত যোগ তাহাদের সমস্ত দূঃখকে হরণ করে।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া নানা অস্বাভাবিক চিন্তা কর্ম, সাংসারিক জীবনের কঠিনতম প্রতিদ্ধন্ধিতা সবকিছুইতো আমাদের আস্তে আস্তে গ্রাস করে। প্রশ্নকারী তাই আরোতর সহজ করণীয় জানতে চাইলেন। উত্তরদাতাও কিছু সাবধান বাণী দিয়েছেন।
সেগুলো হলো: ১. অবৈধ আহার না করা (যাতে পরিপাকের অবসন্নতা ঘটে) ২. নিয়মিত নিঃস্রাবন (প্রস্রাব, বাহ্য, ঘর্ম, লালা, শুক্র ইত্যাদির স্বাভাবিক নিঃসরণ) ৩. যথোপযুক্ত চেষ্টা ও চলন ৪. সর্বোপরি, ইষ্ট বা ভগবদনুরক্তি (ইষ্ট মানে মঙ্গল, সদা প্রতি-প্রত্যেকের মঙ্গল চিন্তা করা) ।

এতে আমরা দেখতে পাই, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অনাহার আমাদের শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেসব খাবার আমাদের শরীর বিধানকে অবসাদগ্রস্থ করে তোলে তা থেকেও দূরে থাকার আভাস আমরা পায়। শরীরের সকল ক্ষতিকারক, বিষাক্ত দ্রব্যগুলো যাতে বের হয়ে যেতে পারে তার জন্য নিয়মিত নিঃস্রাবনের কথা বলা হয়েছে। যথোপযুক্ত চেষ্টা ও চলন থাকলে আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু মস্তিষ্ক অযথা অবসাদগ্রস্থ হবে না এবং চলনও যদি নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে মাংসপেশী ও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও সতেজ থাকবে। আর, ভগবদনুরক্তির কথা কি বলব, গুরুকে শ্রদ্ধা আমাদের জন্য কতটা জরুরি সে প্রসঙ্গে সুপ্রাচীন বৈদ্যশাস্ত্রে, ইষ্টানুরক্তি না থাকা একটা অরিষ্ট বা মৃত্যুলক্ষণের মধ্যে গননা করা হয়েছে।

কিন্তু তাতেও প্রশ্নকর্তার মনঃপূত হয় না। তিনি উত্তরদাতাকে জীবনীশক্তি ও আয়ুবৃদ্ধি করতে হলে আমাদের জাতির ঠিক কী কী করণীয়, যা আমরা সহজেই করতে পারি তা জানতে চাইলেন, উত্তরদাতাও যথারীতি বললেন, এগারটি বিশেষ বিষয়ের কথা।
১. ইষ্টে সহজপ্রাণতা, তঁদ্বিত্তপরায়ণতা ও তৎপ্রতিষ্ঠ হয়ে তৎস্বার্থপরায়নতা।
২. পারিপার্শ্বিকের প্রতি সেবা, সম্বর্দ্ধনা, সাহার্য্য ও সাহচর্য্য পরায়ণ হয়ে তাদের ইষ্টস্বার্থ ও ইষ্টপ্রতিষ্ঠায় প্রবুদ্ধ করে তোলা।
৩. নিয়মিত সন্ধ্যা, প্রার্থনা, ব্রাহ্মমুহুর্ত্বে শয্যাত্যাগ (সূর্যোদয়ের পূর্ব মুহুর্ত্বে) এবং প্রথমে একক ভ্রমন ও তৎপর অর্দ্ধ হইতে এক ড্রাম থানকুনি পাতার রস একটু দুধ ও ইক্ষুগুড় দিয়ে বা শুধু ইক্ষুগুড় দিয়ে খেয়ে, বেশী পরিমানে জল খাওয়ার পর সঙ্গিগনসহ ভ্রমনে আরো সুবিধা হতে পারে। এতে একটু বেশী প্রস্রাব হয়ে শরীরের Toxin গুলো প্রায়ই বেরিয়ে গিয়ে থাকে।
৪. বেশ সাদাসিদে সহজ-পুষ্টিকর সুপাচ্য আহার সাধারণত দিনে রাত্রে দুবার।
৫. ক্ষুধাকে কখনো জব্দ না করা – regulated uncivilized রকমে সম্ভবমত কম প্রয়োজনের ভিতর দিয়ে জীবন চালান।
৬. বিরুদ্ধভাবের সংঘাতে Temper lose না করা – অন্তঃত unprofitably temper lose না করা।
৭. 7. Unregulated ভাবে যাতে নাকি শরীর ও মনের অবসাদ আসে এমনভাবে স্ত্রী সহবাস না করা; অন্তঃত স্ত্রী কতৃকsolicited না হয়েsexuall y engaged না হওয়া।
৮. 8. Life with Superior Beloved; life in seclusion, life with immediate environment, i.e; with family and life for and with the public – একটি factor সম্ভবত বেশ করে observe করা।
৯. কু-ব্যাধি সংক্রমণের বিস্তার প্রতিরোধী আচার-নিয়মকে প্রতিপালন করে শুদ্ধ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাসকে জীবনে সহজ করে তোলা।
১০. শুধু ভাবপ্রবন না হয়ে ভাব ও বোধগুলিকে করা-বলার ভিতর দিয়ে জীবন বৃদ্ধির অনুগ করে বাস্তবে পরিণত করা।
১১. শরীর ও সময়ের উপযুক্ততা হিসাবে মাঝে মাঝে নাম মাত্র আহার করা বা বিধিপূর্বক উপবাস করা।
আমার মনে হয় সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু হওয়ার সব মন্ত্রই উপরোল্লেখিত এগারটি বিষয়ের মধ্যেই আছে। সংক্ষেপে এ ১১টি বিধানকে আমরা Guideline for long life বলতে পারি। এই ১১টি বিষয়ের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে আমি কিছু তুলনামূলক আলোচনা করলে আপনারা বিষয়গুলো আরো ভালভাবে উপলব্দি করতে পারবেন।

এখানে নিয়মিত প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে। স¤প্রতি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে যেসব ব্যক্তি নিয়মিত প্রার্থনা বা Prayer করেন, তারা অন্যদের তুলনায় গড়ে ১০-১৪ বছর বেশীদিন আয়ুস্কাল লাভ করে।
এখানে থানকুনি পাতার রসের কথা উল্লেখ আছে। Newyork Times এর একটি সংখ্যায় আমরা দেখি, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবন যে চীনা জাতি লাভ করে, তাদের গোষ্ঠীগতভাবে জীবনাচরণে দেখা যায়, তারা থানকুনি পাতার রস নিয়মিত সেবন করে। যা তাদের শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বর্হিগমনে সহায়তা করে।
সহজ-পুষ্টিকর সুপাচ্য আহারের কথা মনে হয় বলার কোন অপেক্ষা রাখে না। ক্ষুধাকে জব্দ না করার জন্য বলা হয়েছে, এ ক্ষুধাকে জব্দ করেই আজকালকার সময়ে সর্বজন বিদিত সমস্যা গ্যাস্টিক আলসারের সৃষ্টি। কিন্ত তার সাথে সাথে সহজ সরল অর্থাৎ Simple life, High thinking এর কথা বলা হয়েছে।

প্রবন্ধের এ পর্যায়ে আমার মনে হয় উত্তরদাতার পরিচয়টা প্রদান করা উচিত। তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন, বাংলা ১২৯৫ সনের ৩০শে ভাদ্র, তাল নবমী তিথিতে এ বাংলার পাবনায়

হিমায়েতপুর গ্রামে। পেশায় তিনি কিছুদিন ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। কিন্তু যে দার্শনিক শক্তি তিনি লাভ করেছিলেন, তা তাঁর এসব ক্ষুদ্র পরিচয়ের গন্ডিকে ভেদ করে পৌঁছে গিয়েছিল অনেক উর্দ্ধে। পাবনার সাধারণ জনগন তাঁকে অনুকূল ঠাকুর নামে জানে। তাঁর ভক্তদের কাছে তিনি দয়াল ঠাকুর। পুরো নাম অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী। শুধুমাত্র আয়ু বাড়ানোর কৌশল বাতলে দিয়েই তিনি কান্ত হননি। সর্বমানবের মঙ্গলাকাঙ্কী, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পুষ্টিবিদ, চিকিৎসক কিভাবে স্বাস্থ্য ভাল রাখতে হয় তারও সহজ সাধারণ ব্যবস্থা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, স্বাস্থ্য ভাল রাখতে হলে – প্রথমেই চাই পারিবারিক শান্তির ব্যবস্থা। স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রনে প্রধান ও প্রকৃষ্ট শিক্ষক যদি নিজ নিজ পরিবার হয়, তো তার চাইতে সুন্দরব্যবস্থা আর কি হতে পারে?
তিনি আরো বলেছেন, আমাদের বাসস্থানে যথেষ্ট পরিমান আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সর্বোপরি তিনি সুস্বাস্থ্যের জন্য পরিবারের সকলের মধ্যে সুসম্পর্কের উপর জোর দিয়েছেন। কারণ, হতাশ্বাস ও অবসাদই স্বাস্থ্য ভাঙনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের উল্টো চলন তাকে আরো বেগবান করে মাত্র।

এ পারিবারিক বিষয়ে তিনি নারীদের উপর বেশী নির্ভর করার কথা বলেছেন। কারণ, একজন নারীই প্রকৃতপক্ষে একটি পরিবারের মূল পরিচালক। তার অবশ্যই জানা থাকতে হবে পরিবারের সকলের সুস্বাস্থ্যের জন্য কেমনতর আহার, শুশ্র“ষা ও সেবার দরকার। এজন্য তিনি মেয়েদের গাহর্স্থ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব বিষয়ের অন্তর্ভূক্তি ও অনুধাবনের উপর জোর দেন।

আমরা অন্তঃত প্রত্যেকে এটা উপলব্দি করতে পারি, একটি সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস আমাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে।

এরপর তিনি জোর দিয়েছেন পারিপাশ্বিকের সেবা ও সম্বর্দ্ধনার দিকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এ ধরণের সেবামূলক চলন হতে একজন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিক দুই ধরণের শক্তিই অর্জন করতে পারে। যদি আমরা এমনতর শারীরিক পরিশ্রম করতে না পারি তাহলে আমাদের প্রয়োজন হবে ব্যায়ামের।

সুস্বাস্থ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে তিনি উপযুক্ত বিবাহকে চিহ্নিত করেন। যা তার শারীরিক ও মানসিক শান্তি প্রদানে যথেষ্ট পরিমাণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী কোন লেখায় তাঁর আহার বিষয়ক বিধি বিধান তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। সর্বোপরি, যদি সকলের মঙ্গল চিন্তা করা যায়, নিজে আনন্দে থেকে প্রতিবেশীকে কিছুটা হলেও আনন্দে থাকার ব্যস্থা করা যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম নিজেরা করতে পারি, তবেই আমরা সুস্বাস্থ্য তথা দীর্ঘায়ু লাভ করতে পারব।

পরমচরিত সন্ধানে (পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ)

শ্র্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন, “ আমি বলছি প্রচার ছাড়া হবে ন। তোমরা ক’টা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পার, আর হাওয়া যেমন বইছে তাতে প্রচার চাই-ই কি চাই। ”
“মহাপুরুষের বাণী রোজ বের করা দরকার, মহাপুরুষের কথা যদি মানুষ জানতে না পারে, তাহলে মানুষ বাঁচবে কি করে, ঐক্যবদ্ধ হবে কি করে?”
“…. একটা কথা বলি আমার দায়টা যদি আপনাদের দায় হয়ে না দাঁড়ায় তাহলে আপনাদের স্বার্থ ও পরমার্থ দুই-ই খাবি খেতে থাকবে। ”
“……জানবেন ধর্ম, কৃষ্টি ও জীবন সম্বন্ধীয় ভ্রান্তির অপনোদনে অর্থাৎ পরমপিতার বাণী প্রচারে যারা ব্রতী হবে যারা তারা মহাভাগ্যবান।”


তাই পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের জীবনাদর্শ প্রচারে যারা ব্রতী হয়েছেন তারা মহাসৌভাগ্যবান। এ মহাপুরুষেরাই আমাদের ঐক্যের স্থান। আমি প্রচলিত ধারার বাইরে একটা অন্যদৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্দি করতে চাই। তাই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মরহস্যের কাহিনী আপনারা জানেন এবং এ প্রকাশনায় অনেক লেখকই হয়ত তা উল্লেখ করবেন। তাই আমি সেই অংশটি আর উল্লেখ করছিনা।

ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে প্রায়শই বংশী-বাদনরত এক কিশোরের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।আবার ভগবদ্গীতায় তিনি এক পথপ্রদর্শক ও সহায়ক তরুণ রাজপুত্র। হিন্দু দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি বহুধা পরিব্যাপ্ত।তাঁকে কল্পনা করা হয়ে থাকে বিভিন্ন রূপে: কখনো শিশুদেবতা, কখনো রঙ্গকৌতুকপ্রিয়, কখনো আদর্শ প্রেমিক, কখনো দিব্য নায়ক, আবার কখনো বা সর্বোচ্চ ঈশ্বর।কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি মূলত লিখিত আছে মহাভারত, হরিবংশ, ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থে।
চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই বাসুদেব, বালকৃষ্ণ ও গোপাল প্রভৃতি কৃষ্ণের নানা রূপের পূজাকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতেই দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণভক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর ভারতে কৃষ্ণধর্ম সম্প্রদায়গুলি সুপ্রতিষ্ঠিত হয় মোটামুটি একাদশ শতাব্দী নাগাদ। দশম শতাব্দী থেকেই ভক্তি আন্দোলনের ক্রমবিস্তারের ফলে কৃষ্ণ শিল্পকলার এক মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠেন। ওড়িশায় জগন্নাথ, মহারাষ্ট্রে বিঠোবা, রাজস্থানে শ্রীনাথজি প্রভৃতি কৃষ্ণের রূপগুলিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ভক্তিসংস্কৃতিও বিকাশলাভ করে।

সংস্কৃত কৃষ্ণ শব্দটির অর্থ কালো, ঘন বা ঘন-নীল। কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কৃষ্ণের মূর্তিগুলিতে তাঁর গায়ের রং সাধারণত কালো এবং ছবিগুলিতে নীল দেখানো হয়ে থাকে।
কৃষ্ণ নামের অর্থ-সংক্রান্ত একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মহাভারতের উদ্যোগপর্বে (৫।৭১।৪)বলা হয়েছে কৃষ্ণ শব্দটি কৃষ এবং ণ এই দুটি মূল থেকে উৎপন্ন। কৃষ শব্দের অর্থ টেনে আনা বা কর্ষণ করা; সেই সূত্রে শব্দটি ভূ (অর্থাৎ, অস্তিত্ব বা পৃথিবী) শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ণ শব্দটিকে নিবৃত্তি শব্দের প্রতিভূ ধরা হয়। মহাভারতের উক্ত শ্লোকটি চৈতন্য চরিতামৃত ও শ্রীল প্রভুপাদের টীকায় ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে ভূ শব্দটির নিহিত অর্থ আকর্ষণীয় অস্তিত্ব; অর্থাৎ কৃষ্ণ শব্দের অর্থ সকল দিক থেকে আকর্ষণীয় ব্যক্তি। ভাগবত পুরাণের আত্মারাম স্তবে কৃষ্ণের গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে।বল্লভ সম্প্রদায়ের ব্রহ্মসম্ভব মন্ত্রে কৃষ্ণ নামের মূল শব্দগুলিকে বস্তু, আত্মা ও দিব্য কারণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পাপের বিনাশশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত হয়েছে।
বিষ্ণু সহস্রনামের ৫৭তম নামটি হল কৃষ্ণ, যার অর্থ, আদি শঙ্করের মতে আনন্দের অস্তিত্ব। কৃষ্ণের একাধিক নাম ও অভিধা রয়েছে। কৃষ্ণের সর্বাধিক প্রচলিত নামদুটি হল গোবিন্দ (গো-অন্বেষক) ও গোপাল (গো-রক্ষাকারী)। এই নামদুটি ব্রজে কৃষ্ণের প্রথম জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো কোনো নামের আঞ্চলিক গুরুত্বও রয়েছে। যেমন, জগন্নাথ নামটি। ওড়িশায় এই নামে একটি বিশেষ মূর্তিতে পূজিত হন কৃষ্ণ।

গৈর্গ্য মুনি বাসুদেবের অনুরোধে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই দুই সন্তানের নামকরণ করেন। রোহিনীর সন্তানের নাম রাখা হয় রাম এবং দেবকীর সন্তানের নাম রাখা হয় কৃষ্ণ। পরবর্তীতে রাম তার অসীম শক্তি অর্জনের জন্যই বলরাম নামে পরিচিত হন।

অল্প বয়সে বুদ্ধিমত্ত্বা
কংস বধের পরেই বলরাম ও শ্রীকৃষ্ণকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অবন্তি নগরে গুরু সন্দীপনীর আশ্রমে। সেখানে মাত্র ৬৪ দিন সময়কালের মধ্যে তিনি ১৪ ধরণের বিদ্যা ও ৬৪ ধরণের কলা শিখেছিলেন। সাধারণত এ ধরণের একটি বিদ্যা শিখতেই একজনের দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগত।

অসাধারণ ব্যক্তিত্ববোধ
তিনি তাঁর চেয়ে বয়সে বড় অনেকের সাথেই খুবই আন্তরিকভাবে মিশতেন। খুবই অল্প বয়সে, তিনি গোয়ালাদের মথুরা যেতে আপত্তি করেন কারণ, শয়তান কংসের নিকট দুধ বিক্রির মাধ্যমে টাকা আয় করতেন তিনি চাননি। সেই থেকেই বয়স্করাও তার উপদেশ মানতে শুরু করেন এবং তিনি তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণকে বন্দি করার জন্য অত্যাচারী জরাসন্ধের সেনারা ১৮ বার মথুরা ঘেরাও করেন। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে এ কান্ড আর ঘটেছে।

 

  • আদর্শ পারিবারিক ও সামাজিক জীবন

আদর্শ সন্তান: শ্রীকৃষ্ণ এমনতর আচরণ করতেন যাতে সর্বদায় পিতা বাসুদেব ও মাতা দেবকী এবং তাঁর অভিভাবক নন্দ ও যশোদা সন্তুষ্ট থাকেন। তাদের সামান্যতম কষ্ট নিবারনেও তার উদ্ভিগ্নতা লক্ষ্য করা যায়।

আদর্শ ভাই: কৃষ্ণ সর্বদায় বড়ভাই বলরামকে শ্রদ্ধা করতেন। ভাইয়ের প্রতি একজন মানুষের কেমনতর আচরণ হওয়া উচিত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ।

আদর্শ স্বামী: যখন একজন স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখাই কষ্টসাধ্য, সেখানে কৃষ্ণ তাঁর ১৬০০৮ স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রেখেছিরেন। নারদ তাদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টির যে চেষ্টা করেছিলেন তাও সম্ভব হয়নি।

আদর্শ পিতা: যেহেতু তার সন্তানেরা অসত্য ও অসৎপথে পরিচালিত হয়। তিনি নিজেই নল-খাগড়ার  যুদ্ধে তাদের ত্যাগ করেন চিরতরে।

কলা প্রিয় একজন :
শ্রীকৃষ্ণ নৃত্য ও গীত এসব কলা খুবই পঠন্দ করতেন তাই নয়, তিনি নিজে এসব বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর বাশির সুর আর রাস নৃত্যের কাহিনী প্রসিদ্ধ। তিনি যখন বাশি বাজাতেন মানুষতো বটে, এমনকি পশু-পাখি পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত।

  •  সামাজিক প্রেক্ষাপটে

অন্যায়ের প্রতিবাদী: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, অন্যায় যে করে,/ আর অন্যায় যে সহে,/ তব ঘৃণা যেন তারে / তৃণসম দহে। শ্রীকৃষ্ণ শৈশব থেকে কখনোই কোন অন্যায়কে প্রশয় দেননি। বরংচ প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কংস, জরাসন্ধ ও কৌরবদের মত ধূর্ত ও অত্যাচারীদের বিপক্ষে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন।

সামাজিক দায়িত্ব পালনে সচেতনতা: যখন তিনি নারকাসুরের কারাগার থেকে ১৬০০০ রাজকন্যাদের মুক্ত করেন, তখন এইসব মহিলাদের কোন সামাজিক অবস্থান ছিল না। এমনকি সমাজে মুখ দেখানোর কোন অবস্থায় ছিল না!  তারা তখন সমাজের কাছে অপাক্তেয় ছিল। এ ব্যাপক সংখ্যক নারীদের সামাজিক মর্যদাহীনতা সমাজে বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করত। শ্রীকৃষ্ণ এই ১৬০০০ নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেন এবং পৃথিবীর ইতিহাসে সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কিন্তু ইদানিং অনেকেই এ বিষয় নিয়ে হাস্যÑরসাত্মক গল্প করেন। এ রকম মহামানবকে নিয়ে এ ধরণের তামাশা যারা করে এবং যেসব নব্য কৃষ্ণ প্রেমিকদের ভূল প্রচারের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ধিক, শতধিক।

পরকল্যাণে আত্মোৎসর্গী : কিছু কিছু লোক পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন আচরণের সমালোচনা করেন। এগুলো তাদের মূর্খতা ও নষ্ট চিন্তার বহি:প্রকাশ মাত্র। বরংচ তিনি সারা জীবনে যা’ই করেছেন, তা অন্যের কল্যাণের জন্য। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পায় তিনি বিভিন্ন সময়ই অনেক প্রথা ও নিয়ম ভেঙেছেন। যেমন তিনি সুভদ্রাকে অপহরন করার সময় জরাসন্ধকে বধ করেন, যাতে অর্জুন সুভদ্রাকে বিয়ে করতে পারে, ১৬০০০ নারীকে বিয়ে করা ইত্যাদি। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের সময়, তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি স্বহস্তে অস্ত্র ধারণ করবেন না। কিন্তু ভীষ্মাচার্য্য প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণকে অস্ত্র ধারণ করাবেনই। শ্রীকৃষ্ণ এমনতর পরিস্থিতিতে তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছিলেন এবং অস্ত্র ধারণ (চাকা) করে ভীষ্মাচার্য্যকে আক্রমণ করেছিলেন।

সমাজের কল্যান কাজে অন্যদেরকে পরিচালিত করা:  সামাজিক নিরাপত্তা তথা সমাজের সুরক্ষাই ছিল তাঁর মূখ্য উদ্দেশ্য। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সমাজের সমস্যা সৃষ্টিকারী ও অসৎলোকদের চিরতরে দূর করার জন্য এটা অতীব প্রয়োজনীয়। শুধুমাত্র সত্য ও শুদ্ধতা নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকলে কখনই  দুষ্টকে দমন করা যাবে না। মানব ইতিহাসের এই দূর্ভাগ্যজনক সত্যটুকু উপলব্দি করে, তাদেরকে জাগতিক বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত হতে হবে। যদি তা না হয়, এই আইনের বালাইহীন বিশ্বে, নিষ্ঠুর অসুরেরা রাজত্ব করত এবং সামাজিক নীতি পাল্টে যেত এবং মূল লক্ষ্যই ব্যহত হত। এটাই ছিল বুদ্ধিমত্ত্বার সহিত পরম পুরুষের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এটা এ কারণে যে, অনেক সময় “ সত্যের চেয়ে আপাত মিথ্যাকে অনেক উত্তম বলে মনে হয়” এবং “একজনকে ধর্মের বা সত্যের পথ ছেড়ে আপাত দৃষ্টিতে উল্টো পথে যেতে হয়”। “ভীমসেন সফল হতেন না, যদি তিনি সৎপথে লড়াই করতেন। তাঁর ঐভাবে লড়াই করারই প্রয়োজন ছিল”, এগুলো প্রায়ই তিনি (শ্রীকৃষ্ণ ) বলতেন।

  • রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ খেকে

একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ:
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এড়ানোর জন্য শ্রীকৃষ্ণ (যিনি নিজেও দ্বারকা রাজ্যের শাসক ছিলেন)একজন মধ্যস্থতাকারী ও কুটনৈতিক হিসাবে বিনীতভাবে চেষ্টা করেছিলেন, যাতে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। শেষমুহুর্ত্বেও পান্ডব ও কৌরবদের মধ্যে যাতে দ্বন্ধের একটি সমাধান আসে, সেজন্য যে অক্লান্ত পরিশ্রম, কৌশলী উদ্যোগ ও ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা মহাভারতের প্রতিটি পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। 

মহাভারতে আমরা শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পায় একজন সেবামূখর নেতা হিসেবে। পাশ্চাত্য পন্ডিতেরা যাকে বলেন servant-leade । তিনি রাজক্ষমতা প্রয়োগ না করার  (যদিও তা শ্রীকৃষ্ণের প্রচুর ছিল) পরিবর্তে দুইপক্ষের কথা শুনে, তাদের মর্মব্যাথা উপলব্দি করে,  শান্তির পথে তাদের ঐক্যমত সৃষ্টি করতে,  এবং অতীতের ভূল কাজের জন্য সমবেদনা ও শান্তনা  দিয়ে ( যেসব কারণে তাদের শান্তি আলোচনা ভেঙ্গে যেতে পারে) শ্রান্তির দূত হতে চেয়েছিলেন। যদিও তিনি জানতেন, কৌরবরা এতটাই দুষ্ট প্রকৃতির ছিল যে, বিনা শক্তি প্রয়োগে তারা কিছুই ছাড়বে না। তা স্বত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ কৌরবদের সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন, যাতে পান্ডবদের অন্তত: কিছু ন্যায়সঙ্গত অধিকারের বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌছানো যায়।servant-leader  এর নেতৃত্বের গুনাবলী নিরূপণে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী Greenleaf   যে প্রধান ১০টি বিষয়ের কথা বলেছেন, সেগুলো হলো listening, empathy, healing, awareness, persuasion, conceptualization, foresight, stewardship, commitment to growth of people, ও building community  । এসব গুণাবলী শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণমাত্রায় ছিল।

একজন অসাধারণ বক্তা:   শ্রীকৃষ্ণ খুবই দক্ষতা, কেীশলী প্রকাশ ও বুদ্ধিমত্তার সহিত কৌরবদের রাজকীয় দরবার সভায় পান্ডবদের বিষয় উপস্থাপন করেছিলেন। এই ঘটনা এবং প্রাপ্তি বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতার মাধ্যমে তিনি পান্ডব শিবিরের সবার মন জয় করেছিলেন এবং লড়াইয়ের শেষ পর্যন্ত তাদের উজ্জীবিত রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।

একজন দক্ষ কুটনীতিবিদ:  কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এড়ানোর জন্য শ্রীকৃষ্ণ (যিনি নিজেও দ্বারকা রাজ্যের শাসক ছিলেন) একজন মধ্যস্থতাকারী ও কুটনৈতিক হিসাবে বিনীতভাবে চেষ্টা করেছিলেন, যাতে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। শেষমুহুর্ত্বেও পান্ডব ও কৌরবদের মধ্যে যাতে দ্বন্ধের একটি সমাধান আসে, সেজন্য যে অক্লান্ত পরিশ্রম, কৌশলী উদ্যোগ ও ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা মহাভারতের প্রতিটি পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

একজন সত্যিকারের মনোবিজ্ঞানী:   কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধের একজন বিশিষ্ট যোদ্ধা কর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ সঠিক ও উপযুক্ত সময়, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতিতে কর্ণকে তার জন্মরহস্য প্রকাশ করেন। এর ফলে এই শক্তিমান ও কৌশলী যোদ্ধা মানসিকভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারান ও তার মনোবল অনেকখানিই ভেঙ্গে পড়ে।

 

  • যুদ্ধের বিবেচনায়

লড়াইয়ের একজন বিশেষজ্ঞ:
একজন দক্ষ তীরন্ধাজ: অর্জুনের মত, শ্রীকৃষ্ণ তার ধনুক থেকে তীর ছুড়ে ঘূর্ণায়মান মাছের চোখে আঘাত করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রানী লক্ষনাকে জয় করেন।
একজন দক্ষ গদা যোদ্ধা: শ্রীকৃষ্ণ বক্রদন্তকে গদা দিয়ে লড়াইয়ে খুবই কৌশলীভাবে হত্যা করেন।
একজন দক্ষ মল্লবীর: শ্রীকৃষ্ণ চান্নুরকে মুষ্টিযুদ্ধে হত্যা করেন।

সাহসী ও নির্ভীক: শ্রীকৃষ্ণ অনেক অত্যাচারী রাজন্যবর্গ ও অসুরকে দমন করেছেন, যারা মিথ্যা ক্ষমতার দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিল। যারা আসুরিক শক্তির দাপটে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যই সমাজ থেকে মুছে দিয়েছিল।

একজন দক্ষ সারথী: কুরুক্ষেত্রের অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের যুদ্ধে খুবই দক্ষতার সাথে যেমন অর্জুনের রথ পরিচালনা করেছেন, তেমনি একজন জীবন সারথী হিসেবে তিনি অর্জূনকে মহামূল্যবান দিক-নিদেশনা প্রদান করেছিলেন।

 

নিস্বার্থ:  শ্রীকৃষ্ণ কংস ও আরো অনেক রাজাকে পরাজিত ও হত্যা করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন স্বর্ণরাজ্য দ্বারকা কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তিনি রাজসিংহাসন বা মুকুট ধারণ করেননি। যদিও নি:সন্দেহে তিনিই ছিলেন সেই সময়কার সাধারণ মানুষদের মুকুটহীন সম্রাট।

বিনয়ী: পান্ডব কতৃক আয়োজিত রাজসূয়া যজ্ঞের সময়, শ্রীকৃষ্ণ ব্রাহ্মনদের নিজহাতে পা ধুয়ে দিয়েছিলেন এবং অতিথিদের এ্যাঁটো খাবার বাসনগুলোও পরিষ্কার করেছিলেন।

 দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে
শ্রীকৃষ্ণ যে অমৃত দর্শন প্রচার করেছেন তাই ‘গীতা’। তাঁর এই দর্শনে তিনি আসক্তি ও অনাসক্তির মধ্যকার উপযুক্ত মেলবন্ধন দেখিয়েছেন। তিনি বেদ অনুসারে কর্মযোগের সমর্থন দিয়েছেন, জ্ঞানযোগকে সমর্থন দিয়েছেন সাংখ্য দর্শন অনুসারে। অবচেতন মনের ঝোঁকগুলোর উপর আত্মনিয়ন্ত্রেনের মত দিয়েছেন যোগের পথানুসারে এবং সন্ন্যাসকে সমর্থন দিয়েছেন বেদান্ত অনুসারে। কিন্তু এসব প্রত্যেকটি বিষয়ই এককভাবে চূড়ান্ত  যে প্রস্তাবনা এসব শাস্ত্রে আছে, তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি প্রত্যেকটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত সাম্যতা প্রদান করেছেন এবং নিষ্কাম তথা ফল প্রত্যাশাবিহীন কর্মের উপর ভিত্তি করে তিনি এক নতুন নীতির প্রবর্তন করেন। ভাগবত গীতায়, তিনি মূলত: একজন ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে দায়িত্বগুলো কিভাবে পালন করা উচিত তাই প্রচার করেছেন। প্রাচীন ঋষিরা একজন ব্যক্তির কি দায়িত্ব তা নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে সেই দায়িত্বগুলো ভালভাবে পালন করতে হবে, তা প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা দিয়েছেন বা করেছেন। ভাগবত গীতায়, তিনি অর্জুনকে কিভাবে আসক্তিকে অনাসক্তিতে রুপান্তরিত করা যায় এবং কিভাবে একজন ব্যক্তিকে তার সামগ্রিক দায়বদ্বতা পালন করা উচিত তা বিবৃত করেছেন।

গুরু হিসেবে
শ্রীকৃষ্ণ মৌখিকভাবে গীতার বানীগুলো বিবৃত ও ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে অর্জুনের বিভ্রান্তি দূর করেছিলেন এবং যে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তাকে প্রদান করেছিলেন তা বর্ণনাতীত। যা মানব ইতিহাসে মানবজীবন সূচারুভাবে পরিচালনা করার প্রামান্য দলিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি জ্ঞানমুদ্রা ধারণ করেছিলেন।

পরবর্তী উদাহরণগলো উপরোক্ত সকল গুণাবলীর প্রভাব অন্যদের কেমন আলোড়িত করেছিল, তা পরিষ্কার করবে।

  •    কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে,  কেউই শ্রীকৃষ্ণকে আঘাত করতে চাইনি বা ভাবেওনি। যদিও অন্য রথ সারথীরা কিন্তু আক্রান্ত হয়েছিল।
  •     যুদ্ধের পরে, সেখানে মৃত্যু সম্পর্কে ভালচার  ও শিয়ালের আলাপচারিতা ছিল। তার মধ্যে, তারা সকলের ত্র“টি নিয়ে আলোচনা করেছিল, এমনকি যুধিষ্ঠিরের দোষ-ত্র“টি নিয়ে আলোচনা ছিল। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের বিষয়ে একটি শব্দও লক্ষ্য করা যায়নি।

 

আজ এ অস্থির সময়ে এসে আমরা শ্রীকৃষ্ণকে যে রুপে দেখছি তা সত্যিই দূর্ভাগ্যজনক। আজ বিকৃত ইতিহাস আর বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে সাধারণের কাছে তুলে ধরা হয়েছে ভিন্নভাবে। গত কয়েক মাস আগে স্টার জলসা নামক এক টিভি চ্যানেলে এক নব্য কৃষ্ণ প্রেমিকের তার পিতা-মাতার প্রতি যে অবহেলার চিত্র দেখেছি তা সত্যিই আশংকার কথা। শ্রীকৃষ্ণ একাধারে আদর্শ পুত্র, ভাই, স্বামী ও পিতা ছিলেন। কারো দায়িত্ব তিনি অবহেলা করেননি। কিন্তু আজ নব্য কৃষ্ণ প্রেমিকরা সনাতনী আর্য সমাজে এ কি তথ্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে! আমাদের কোমলমতি আগামীরা কি এই সত্য নিয়ে বড় হবে? অসত্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হলো সত্য।আর তথ্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবাধ সঠিক তথ্যের যোগানই পারে এ অপরাধকে রুখতে। আসুন আমরা পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের সত্যিকার জীবনাদর্শ জেনে যোগ্য মানুষ হয়ে উঠি। এই সবার কাছে আমার আকুল প্রার্থনা।

ফিরিয়ে দাও, প্রণতি জানাও শ্রীচরণে

যতটুকু জানি বিশ্বের জনসংখ্যা এখন ৬০০ কোটির উপরে। হারিয়ে গেছে আরো কোটি কোটি মানুষ চিরতরে এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ বেঁেচ থাকে, গেঁথে থাকে, সম্মানিত হয়, অমর হয় তার কমের্র মাধ্যমে, ভালবাসার জীবন্ত প্রতিমূর্তি হয়ে। আর কিছু মানুষ আছেন যারা তাদেরকেও ছাড়িয়ে যান। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম প্রেম, অতুলনীয় প্রজ্ঞায় ও ঈশ্বর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে স্থায়ী আসন করে নেন মানুষের মনে, তারাই হলেন মহামানব। যারা স্থান কালের উর্দ্ধে, সা¤প্রদায়িকতার উর্দ্ধে, জাতি-গোষ্ঠী-বণের্র উর্দ্ধে সবারই প্রণম্য হন। এমনই এক জ্যোতির্ময় পুরুষ পাবনার প্রত্যন্ত পল্লী হেমায়েতপুরে জন্ম নিয়েছিলেন।
তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের শেষার্ধে এ বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সম্প্রীতির এক মহান ধারক, পালক ও বাহক। একটা ঘটনা উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করি।
ঘটনাটি পাকিস্থান পূর্ববর্তী সময়ে, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সমসাময়িক। ঘটনাস্থল পাবনার হেমায়েতপুর। হেমায়েতপুর থেকে নৌকায় পাবনা ফিরছিলেন দুজন লোক। এদের মধ্যে একজনের পোশাক-আশাক ও মুখের দাড়ি দেখে সহজে বুঝা যাচ্ছিল তিনি মুসলমান ও অন্যজন সাহেবী পোশাক পরা । দুজনই প্রথমে অনেকক্ষণ নিরব ছিলেন। হঠাৎ সাহেবী ভদ্রলোক লক্ষ্য করলেন তিনি কিছু প্যাকেটের উপর বসে আছেন। উনি ভাবলে এটা মনে হয় ঐ লোকের তাই তিনি ঐ মুসলমান ভদ্রলোকের কাছে লজ্জা প্রকাশ করলেন । মুসলমান ভদ্রলোক বললেন, এটা তার নয়। তখন সাহেবী ভদ্রলোক বললেন, খ্রীষ্টীয় শিক্ষা পেলাম হিন্দুর কাছে।
মুসলমান লোকটি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি শ্রীশ্রীঠাকুরের কাছ থেকে আসছেন?
হ্যাঁ, আপনি তাকে জানেন?(সাহেব)
খুব ভালভাবেই জানি।(মুসলমান)
একজন খুবই আশ্চর্য্য মানুষ, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, আপনি কি ঠাকুরকে অনেকদিন ধরে চিনেন?(সাহেব)
না খুব বেশিদিন নয়, তবে খুব ভাল মানুষ (মুসলমান)
হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছে বিস্ময়কর মানুষ! (সাহেব)
এরপর সাহেবী লোকটা পরিচয় দিলেন, তিনি ফ্রেড হকইয়ার্ড, পাবনা মিশনের পরিচালক। অন্যজন বললেন, আমি সৈয়দ খলিফুদ্দিন মৌলভী, পাবনা মুসলমান সম্প্রদায়ের। তারপর দুজনই ঠাকুরের বিভিন্ন লোকহিতকর বিষয়াদি আলোচনা করা শুরু করলেন। তারা দুজন ঐক্যমত হলেন তিনি একজন সত্যিকারের মানুষ। মৌলভী সাহেব বললেন, তার মত একজন মানুষ প্রকৃত মুসলমানের মধ্যেও পাওয়া দুস্কর। তার ছেলে হেমায়েতপুরে ঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রমের তপোবন বিদ্যালয়ে পড়ে। সকলকেই ঠাকুর খুবই স্নেহ করেন। এ বিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েদের প্রজ্ঞা, মেধা আর আদব কায়দা দেখলে অবাক হতে হয়। মিশনারির পরিচালক হকইয়ার্ড বললেন, আমার কাছে উনাকে ভারতীয় যীশু খ্রীষ্ট বলেই মনে হয়েছে। আমি ইনার সাথে আলাপ করতে করতে এমন জায়গায় পৌছেছিলাম, একজন খ্রীষ্টানের সাথে কথা বলে তা সম্ভব হতো না। উনার সাথে কথা বলে এমন এক ভাবের ও উপলব্দির সৃষ্টি হয় যা গীর্জায় বাইবেলের উপর বক্তব্যের সময়ও হয় না। তারপর দুজনে অনুভব করলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের বদৌলতে কিভাবে একজন খ্রীষ্টান, একজন মুসলমানের বন্ধুতে পরিনত হলেন। তৎকালীন সময়ে হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান দ্বন্দ লেগেই থাকতো। শ্রীশ্রীঠাকুর অসা¤প্রদায়িকতার যে আলো হেমায়েতপুরে ছড়িয়েছিলেন তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র ভারতবর্ষে। কিন্তু তাঁর প্রতি এ বাঙ্গালীরা কি প্রতিদান দিল? ইতিহাস খুব সুখের নয়। খুব গৌরবেরও নয়।

 শ্রীশ্রীঠাকুর  অনুকূলচন্দ্র

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

আরেকটা ঘটনা বলি, দুই মুসলমান যুবক ঠাকুরের কাছে এসে দীক্ষা
(পথ প্রদর্শক ) নিতে চাইল। ঠাকুর বললেন, তোমরা যদি তোমাদের বিশ্বাস পরিবর্তন করতে চাও, তাহলে তোমরা আমার কাছে এসো না। তোমাদের মহাপুরুষ, পরমপুরুষ অন্যান্য মহাপুরুষের মতই আমার কাছে শ্রদ্ধার আর প্রিয়। তারা অভিমানের সঙ্গে বলেছিল, তোমার কথাতে যা বোঝা যায় তা হলো যে তুমি আমাদের ঠিক গ্রহন করবেনা। ঠাকুর বলেছিলেন, বিভ্রান্ত হয়ো না। তোমরা জন্মগত সংস্কারে যে মহাপুরুষ পেয়েছ দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গেই কিন্তু এক মহামূল্যবান মেলবন্ধন। তাদের মধ্যে একজন কাঁধ ঝাকিয়ে বলে উঠল, তারা কি আপনাকে বলেছে আমাদের গ্রহন না করার জন্য।
ঠাকুর ভালোবাসার সুরে বললেন, দেখ মুহম্মদের প্রতি আন্তরিক,অকৃত্রিম আর অকপট প্রিয় আর শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসা নিয়ে যদি একজন মুসলমান আমার কাছে আসে , তার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে তাকে ভালবাসতে পারে। তাহলে আমিও তোমাদের আন্তরিক আনন্দে হৃদয়ে গ্রহন করতে পারি। তারা ঠাকুরের সম্মুখ হতে চলে গিয়েছিল। প্রায় দুসপ্তাহ পরে আরও তিনজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তারা হেমায়েতপুর এসেছিল এবং তাদের ভূল স্বীকার করেছিল। তারা বলেছিল, আপনি সেদিন ঠিক কথা বলেছিলেন। আপনার কাছ থেকে ফিরে গিয়ে প্রতিদিন রাতে আমরা মহম্মদের শিক্ষাকে উপলব্দি করতে চেষ্টা করেছি। তিনি সত্যিই মহামানব। কিছু কিছু বিষয় ভূল জানা আর বোঝার ভূলের কারনে আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। ইনিই শ্রীশ্রীঠাকুর, পাবনার কৃতি সন্তান শ্রীশ্রীঠাকুর। তার জন্মস্থান হেমায়েতপুর, যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সৎসঙ্গ আশ্রম। যেখানে এ মহামানবের স্মৃতি, বেদনার শেল হয়ে বিঁধে তাঁর অগনিত ভক্তগনের কাছে। যিনি আজ মানবতাবাদী সকলের প্রণম্য। পাবনা আজ ধন্য হতে পারত তাঁর এ গবির্ত সন্তানের জন্য কিন্তু পাবনা এখন জানেও না তাঁর সম্পর্কে। যার আদর্শ,কৃষ্টি, বাণী নিয়ে পুরো বিশ্বে চলছে গবেষনা, তাঁর জন্ম স্থান পাবনা ও পাবনার সাধারণ জনগণ কি আজো ঘুমিয়ে থাকবে? সরকার কি তাঁর জন্মভূমি ফেরত দিয়ে সম্মান জানবেনা এ মহান মানুষের চরণে?
সাধারণ অর্থে তিনি শুধুমাত্র একজন ধর্মীয় সাধক নন। অবশ্য তিনি ধমের্র সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, ”অন্যে বাঁচায় নিজে থাকে, ধর্ম বলে জানিস তাকে/ধর্মে সবাই বাড়ে, স¤প্রদায়দায়টা ধর্ম নারে।” তাই তিনি এ বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ ধার্মিক। তৎকালীন হেমায়েতপুরে তিনি তার আশ্রমের ভক্তদের সাথে নিয়ে বিনামূল্যে, বিনা পারিশ্রমিকে অনেক নলকূপ স্থাপন করেছিলেন। এমনকি তাঁর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা কেনার টাকা দিয়ে তিনি নলকূপ স্থাপনের জিনিসপত্র ক্রয় করেছিলেন। তাঁর ভক্তরা যখন আপত্তি করেছিল তখন তিনি বলেছিলেন, এ মুহুর্তে মানুষকে বাচাঁনোই প্রধান কাজ। যিনি প্রায়ই বলতেন, আমি একটি সাম্রাজ্য ত্যাগ করতে পারি কিন্তু একজন মানুষকে ত্যাগ করতে পারি না। ইনিই শ্রীশ্রীঠাকুর। পুরো নাম অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর ১২২ তম জন্ম বার্ষিকীতে কি উপহার দেবে তার প্রিয় পাবনার মানুষ? তাঁর সৎসঙ্গ আশ্রম কি তারা সরকারের নিকট থেকে ছিনিয়ে এনে তাকে সম্মান জানাবে? সরকার আর কতবছর চোখ বন্ধ করে থাকবে?
প্রণতি কি জানাবেনা এ মহাপ্রেমিকের চরণে? প্রশ্ন থাকলো।
তিনি সেই ব্রিটিশ আমলে প্রত্যন্ত গ্রামে স্থাপন করেছিলেন জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার এক পিঠস্থান ”বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র”। যেখানে গবেষনা করতেন কৃষ্ণ প্রসন্ন ভট্টাচার্য্যরে (নোবেল বিজয়ী পদার্থ বিজ্ঞানী সি. ভি. রমনের সহকারী গবেষক) মতো তৎকালীন ভারতবর্ষের নামী প্রফেসর ও বিজ্ঞানীরা। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঘূঁণে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়। মাত্র আড়াই বছর শিক্ষা লাভ করে তপোবনের প্রথম ৯ জন ছাত্র পাবনা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিল এবং কৃতিত্বের সাথে পাস করে পুরো বাংলায় আলোড়ন তুলেছিল। প্রতিষ্টা করেছিলেন মনমোহিনী ইনিস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি। যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। আজ সব স্বপ্নের মত মনে হয়, মনে হয় যেন কোন গল্প। কিন্তু ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র এসব বাস্তবেই করেছিলেন। ছিয়াত্তরের মন্নন্তরের সময় তিনি সৎসঙ্গ চালের গুদাম থেকে বিনামূল্যে চাল বিতরণ করার ফলে তৎকালীন সময়ে শুধুমাত্র এই এলাকায় কোন প্রাণ হানির ঘটনা ঘটেনি। ইনিই শ্রীশ্রীঠাকুর, অনেকে বলেন দয়াল ঠাকুর। যার যোগ্য সম্মান এ সময়ের পাবনাবাসী দেয় নি, সরকারও এ মহাপুরুষের জায়গা নিয়ে তামাশা করছে। কিন্তু তাই বলে আমি বলবোনা ধিক্, শত ধিক্ তারে।

তিনি পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রমে প্রতিষ্ঠ করেছিলেন সৎসঙ্গ দাতব্য হাসপাতাল, সৎসঙ্গ ঔষুধালয়, সৎসঙ্গ ক্যামিক্যাল ওয়ার্কস, সৎসঙ্গ মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপ, সৎসঙ্গ ইলেকট্রিক পাওয়ার হাউজ। সৎসঙ্গ পাওয়ার হাউজে স্টিম ও ডিজেল ইঞ্জিল এবং ডায়নামো ছিল। যখন পাবনা শহরে রেড়ির তেলের বাতি জ্বলতো, তখন হেমায়েতপুরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলিয়েছিলেন। এ প্রযুক্তি তার গড়া বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্রেরই আবিষ্কৃত। কেন এ আশ্রম, জ্ঞান চর্চার বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র সরকার বাজেয়াপ্ত করল। সবাই ইতিহাস জানতে চেষ্টা করুন। কেন আজো অবমুক্ত হলো না ঠাকুরের জায়গা? কেন তাঁর জায়গা এ স্বাধীন বাংলাদেশেও অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি হয়ে থাকলো? এ প্রজন্ম তা জানতে চায়।

আরো ছিল সৎসঙ্গ পাবলিশিং হাউজ, সৎসঙ্গ প্রেস। এ প্রেস ছিল কলকাতার বাইরে সবচেয়ে উন্নত মানের প্রেস। যার তৎকালীন মূল্যমান ছিল একলক্ষ তেত্রিশ হাজার পাঁচশ রুপি। যা পরবর্তীতে পূর্ব-পাকিস্থান গর্ভমেন্ট প্রেস হিসেবে ঢাকায় ব্যবহৃত হয়েছে।

ঠাকুরের কাছে তৎকালীন সময়ে পরামর্শের জন্যে ছুটে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ বসু, দেশবন্ধু সি.আর দাশ, জনার্দন মূখার্জী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ আরো অনেকে। তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক। কত পরিচয় তাঁর আর তুলে ধরব।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, ১৯৪৬ সালে ঠাকুর এদেশ থেকে গেলেন ভারতের বিহার রাজ্যের দেওঘরে। সেখানে গড়ে তুললেন আরেক নব অধ্যায়। সেখানে এখনো চলছে সেই মহা যজ্ঞ। এখানেও সৎসঙ্গ আন্দোলন চলছিল। হঠাৎ একদিন পাকিস্থানী বাহিনী সৎসঙ্গ আশ্রম দখল করল। এ বাংলার, বাংলা ভাষার এক অকৃত্রিম বন্ধুর পবিত্র ভূমি অবহেলার স্বীকার হলো। কি লজ্জা! কি অপমান! তবুও আমরা বলবনা ধিক্! শত ধিক্ তারে।
কিন্তু দূর্ভাগ্য স্বাধীনতার ৩৮ বছরেও এদেশ সম্মান জানায়নি এ সাধকের চরণে। এ কথা লিখতে হাত লজ্জায়, ঘৃনায় কাঁপে। তবুও লিখতে হবে।
দীর্ঘদিন থেকে তাঁরই গড়া সৎসঙ্গ বাংলাদেশ ও তাঁর অগনিত ভক্তরা দাবী জানাচ্ছে সরকারের কাছে। ঠাকুর সর্বদা বলতেন রাষ্ট্রকে মান্য করতে। তাই তারা আজোও প্রানের আবেগে দাবী জানাচ্ছে ঠাকুরের ভূমি ফেরত দিতে এবং শ্রীশ্রীঠাকুরকে শত্র“ হিসেবে নয়, একজন মহান মানব ও বাংলার অকৃত্রিম বন্ধুর মর্যাদা দিতে। জানি না কেন তা করতে গড়িমসি হচ্ছে।
কিন্তু একদিন এ বাংলার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবে, সেইদিন এক মহাত্মার প্রতি, সমাজ-শিক্ষা সংস্কারকের প্রতি, তার জন্মভূমির প্রতি যে অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা রাষ্ট্র থেকে করা হলো তা এক চরম ঘৃণার ইতিহাস হয়ে থাকবে। আগামী প্রজন্ম সবাইকে ধিক্কার দেবে। তারা নিশ্চয় বলবে, ধিক্, শত ধিক্ তারে। তাই এ বাংলাদেশের সকলের প্রতি অনুরোধ সোচ্চার হোন যাতে হিমায়েতপুরে শ্রীশ্রীঠাকুরের গড়া বিশ্ববিজ্ঞান কেন্দ্র ও শ্রীশ্রীঠাকুর যে স্থানে জন্মগ্রহন করেছিলেন সে স্থান অবমুক্ত করা হয়। এ স্থান হতে পারে বিশ্বের সকল অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী ও মানবপ্রেমী মানুষের মহামিলনস্থল। বিশেষ করে পুরো বিশ্বে তাঁর যে কোটি কোটি ভক্তরা ছড়িয়ে আছে তাদের কাছে। এ বাংলা ধন্য হবে তাঁরই শুভ আশিষে। এ পাবনা আবার সেজে উঠবে সেই পুরানো নব সাঁজে। দেশ অর্জন করতে পারে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা। কারণ পাবনা তখন পরিণত হবে পর্যটন কেন্দ্রে। তাই আসুন সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে পাবনার সাধারণ জনগণ। তারাই পারে তাদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে। পাবনা পরিচিত হতে পারে পুরো বিশ্বে এ রকম মহান পুরুষের জন্মদায়িনী হিসেবে। অসা¤প্রদায়িক চেতনা ও দিন বদলে অঙ্গিকারাবদ্ধ সরকার নিশ্চয় ফিরিয়ে দেবে পাবনার গৌরব। ফিরিয়ে দিয়ে প্রণতি জানাবে তাঁর শ্রীচরণে। সেই শুভ দিনের প্রত্যাশায়।